Home Publications Publications on MRM প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেন-

প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেন-

E-mail Print PDF

মল্লিক আমার শুধু ছাত্রই নয়, প্রিয় ছাত্রদের একজন। ওর সঙ্গে সম্পর্ক, সম্পর্কের গভীরতা দীর্ঘদিনের। আমি আমার শিক্ষকদের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করি, ছাত্রদের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করি। আমি দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছি-প্রায় সাড়ে তিন দশক। সংস্কৃতিতে একটা প্রবাদ আছে, সব জায়গায় বিজয় আকাঙ্ক্ষা করলেও তুমি দুজনের কাছে পরাজয় বরণ কর। একজন হচ্ছে পুত্র বা সন্তান আরেকজন হচ্ছে ছাত্র। শিষ্য যদি আমার থেকে বড় হয়, সন্তান যদি বাপের চেয়ে বড় হয়, সেটা কিন্তু বাপের গৌরবের, শিক্ষকের গৌরবের। আজকের দিনে ঐ জিনিসটা কিন্তু ঐভাবে থাকেনি, আমরা যেভাবে দেখেছি।

যাই হোক, মল্লিক আমার প্রিয় ছাত্রদের একজন। আমার যে সব কৃতি ছাত্র আছে কবি ও গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিক তাদের একজন বলে মনে করি। আশির দশকের একজন শক্তিশালী কবি। যথার্থ কবি। ওর প্রথম বই ‘আবর্তিত তৃণলতা’ পড়েই আমি অবাক হয়েছি। আমি দেখতাম ও নানারকম কাজ করে বেড়াচ্ছে। আমি ওকে বললাম তুমি কবিতা লেখ। আমাদের আরেকজন প্র্রিয় কবি গোলাম মোহাম্মদ, একজন বড় কবি, মারা যাওয়ার আগেও একটা কবিতা লিখেছিলেন- সেটা অসম্ভব সুন্দর কবিতা। এই যার ধার, আর কি বলব- মল্লিক নিজের প্রতি বড় সুবিচার করেনি। সমুদ্র গুপ্ত গতবছর এইভাবে মারা যায়। তখন কোনো একটি চ্যানেল আমাকে কথা বলতে বলেছিল। কথা বলে লাভ কি? যদি না আমরা ওকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, যদি আবার আমরা জীবনের ঢেউ ফিরিয়ে আনতে পারি, আবার মতিউর রহমান মল্লিককে কবিতায়, শিল্পে, সাহিত্যে তার কাজে মনোনিবেশ করাতে পারি। তার মতো নিষ্ঠাবান মানুষ আমি কম দেখেছি। প্রকৃতার্থে মানুষ বলতে যা বোঝায়।

আমির্ এলিফ্যান্ট রোডে একটি অফিসে অস্থায়ীভাবে কিছুদিন ছিলাম। সে অফিসে যখন প্রথম দিন ঢুকছি দেখি একটি ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। চিনলাম। পরে যোগাযোগ হলো্। প্রায় বছর পঁচিশেক আমার সাথে পরিচয়। আমি কিন্তু এমনিতেই আমার শিক্ষকদের কাছ থেকে, ছাত্রদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখি। দূরত্ব বজায় রাখি এইজন্য যে, যাতে আমার কাজ অবিঘ্নিত থাকে। আমার স্বভাব এমন, আমি মানুষের সাথে খুব একটা ক্লোজ হতে পারি না বা হইও না। মল্লিক কিন্তু আমার বেড়া ভেঙ্গে দিয়েছে। আমার ক্লোজ হয়েছে। ও যখন অসুস্থ হয়েছে, মাসখানেক আগে জানলাম তখনই বারবার তাকে সাবধান করেছি। শরীরের যত্ন নিতে বলেছি।

যাই হোক, ওর প্রথম কবিতার বই ‘আবর্তিত তৃণলতা’ পড়েই আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমাদের এখানে কবিতা অনেকেই লিখছে। কবিতা এমন একটা জিনিস যেটা ভিতরে না থাকলে হয় না। যত চেষ্টাই করো না কেন, যত প্রতাপ থাকুক, যত মিডিয়া প্রভাব থাকুক কিচ্ছু হবে না। কবিতার বেসিক জিনিসটা, সারৎসারটা যদি ভিতর থেকে না আসে। মল্লিকের ভিতর একটা প্রকৃত কবির বিষয় ছিল। ওর প্রথম বই ‘আবর্তিত তৃণলতা’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এর পরে পঞ্চম বইটি আমার হাতে ‘নিষণ্ন পাখির নীড়ে’। এই বইটা সম্পর্কে ভাবতে আমার আরো খারাপ লাগছে যে, এই বইটা ও আমাকে ভালোবেসে শ্রদ্ধাভরে উৎসর্গ করেছে।

মতিউর রহমান মল্লিক তো বয়সে আমার থেকে অনেক ছোট, বোধ হয় পঞ্চাশের এদিক ওদিক হবে। কিন্তু দেখেছি স্বভাব কবি যেমন, স্বভাব গীতিকার যেমন ওর গানের গলাও ভালো। এর মধ্যে স্বভাব কবিত্বের ব্যাপার বলে একটা জিনিস আছে। তার কবিতা পরিশীলিত। এই দিকটিতে আমি পরে আসছি। কিন্তু আমি তো ওর শিক্ষক। তিন্তু আমার প্রতি ওর যে সেই প্রথম দৃষ্টি তা আমার মনে আছে। একটা কোথাও সে জড়িয়ে পড়েছিল। সবাইকে আশ্রয় দিয়ে, মানে সবাইকে আপন করে তার যে হৃদয়বেদনা তা লক্ষ্য করা যায়। এই বইতে শাহাবুদ্দীন আহমদ, আমাদের একজন সেরা প্রাবন্ধিক, সেরা নজরুল গবেষক তার উপর একটা কবিতা আছে সেটাও আমার ভালো লেগেছে। আমরা কিন্তু জাতি হিসাবে কিছুটা কৃতঘ্ন। তার ভিতর কৃতজ্ঞতাবোধ দেখি। যাইহোক, এখন সেই মতিউর রহমান মল্লিক অসুস্থ। এই বইমেলায় এই বই ‘নিষণ্ন পাখির নীড়ে’ বের হয়েছে। এই বইয়ে আমি আরেকটি জিনিস লক্ষ্য করলাম। বহু ব্যস্ততার মধ্যে ওর যে ক্রমোত্তর, এই বইয়ে মল্লিক শব্দ ব্যবহারে যে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে সেটা আমাদের বইয়ে দেখিনি। এই শব্দ ব্যবহারের যে কৌশল তা তার কবিতাকে অন্যরকম লেখা করে তুলেছে। যেহেতু স্বভাব কবি সেহেতু ওর ছন্দের উপর হাত ভালো, কবিতাও সুন্দর লেখে, সব মিলিয়ে একজন নতুন মল্লিককে আমরা এখানে দেখি। কবিতা যদি প্রকৃত কবিতা হয় এবং ভিতরে যদি একটা চর্চা থাকে, ওর সেটা ছিল ও আছে- তা না হলে এরকম কবিতা হঠা লেখা সম্ভব ছিল না।

আমি আর কি বলব, আল্লাহর কাছে একটাই দোয়া চাইবো- ওর জন্য দোয়া করি যেন আল্লাহ তাকে সুস্থ করে আবার আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনুক এবং ও আবার আমাদের সাথে কাজ করুক। আমাদের এ জীবন তরঙ্গে আবার সে যুক্ত হোক এবং আমাদের সাহিত্যের জন্য, আমাদের সমাজের জন্য, দেশের জন্য কিছু কাজ করা তার দরকার।

আপনাদের আসার কথা শুনে আমার ত্রিদিব দস্তিদারের কথা মনে পড়ছিল। সে কষ্ট পেয়ে মরে গেছে। কবিদের মধ্যে চিরকাল কোথা্ও একটা লাগাম ছাড়া ব্যাপার থাকে। কোথা্ও একটা বেপরোয়া ব্যাপার থাকে। এটা ছিল ত্রিদিব দস্তিদারের। ছিল সমুদ্র গুপ্তের। আছে মল্লিকের মধ্যেও। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে মল্লিককে সুস্থ করে তোলা। ওকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। আজকে অনেক আধৃনিক চিকিসার ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা আশা করব, আল্লাহতাআলার কাছে কাঁদব যে, মল্লিক ফিরে আসুক আমাদের জীবনে। আমি সর্বান্তকরণে কবি, গীতিকার- মতিউর রহমান মল্লিকের সুস্থতা ও আরোগ্য কামনা করছি।

বেঁচে থাকতে মূল্যায়ন নেই কেন?

আমাদের দেশের একটা অসম্ভব বদ অভ্যাস হচ্ছে আমরা বেঁচে থাকতে মূল্য দেই না। মরণের পর কিছুদিন খুব উসাহ থাকে। তারপর আবার বিস্মৃত হই। আরো একটা বিষয় এর সঙ্গে আসে। পুরো বিষয়টার সাথে কিছুটা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। শামসুর রাহমান আমাদের সেরাদের একজন। শামসুর রাহমানকে নিয়ে তার মৃত্যুর পরে যে ঝোঁক ছিল এ বছর দেখলাম সেটা ইতোমধ্যেই বিস্মৃত। কেন এটা হবে? কিন্তু তার কবিতা তখন এখন তো একই। এই জিনিসগুলো আমি চাইব তরুণ প্রজন্মের কাছে- একজন কবি, একজন লেখক বেঁচে থাকতে যথাসাধ্য তার আলোচনা, তার সমালোচনা, তাকে তুলে ধরা সমালোচক ও মিডিয়ার কাজ। ব্যক্তিগত ভাবে যেসব সংগঠন আছে তাদের কাজ এটা। একটা জাতি কিন্তু এমনিতেই অগ্রসর হয় না, এই সব মিলিয়েই হয়। সব রাজনীতি, অর্থনীতির উপর চাপিয়ে দিয়ে আমরা লেখকরা খুব নিরাপদ দূরত্বে থাকব- এই বিষয়টা ঠিক নয়। দেশের প্রতি, জাতির প্রতি আপনার যদি দায়িত্ব থাকে তাহলে আপনাকে এ কাজ করতে হবে। আমি যেমন ব্যক্তিগতভাবে একটা আত্নগোপন মানুষ, কিন্তু আমি কাকে নিয়ে লিখিনি। এই মতিউর রহমান মল্লিককে নিয়েও লিখেছি। আশির দশকের কবিতা নিয়ে আমি যে ভূমিকা লিখেছি, সে বইয়ের ভূমিকায় আছে, ওতে ওই সময়ের ট্রেন্ডগুলো দেখিয়েছি।

আরকেটা জিনিস আছে, যে শিক্ষাটা আমাদের আজকের সমাজে নেই সেটা হচ্ছে আমরা যেন শ্রদ্ধা করতে শিখি- ভালোবাসতে শিখি। যারা বয়োজেষ্ঠ্য আছেন তাদের প্রতি, যারা চলে গেছেন তাদের প্রতি। মূলত লেখকদের ক্ষেত্রেই বলছি, কিন্তু এটা অন্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য- যারা চলে গেছেন, আমাদের সমগ্র জাতির জন্য কাজ করেছেন তাদের আমরা যেন শ্রদ্ধা করতে শিখি। এবং পরবর্তীতে যারা আসছে তাদের প্রতি যেন আমাদের মমত্ববোধ থাকে- ভালোবাসা থাকে। এই হৃদয়টা আমি আমাদের সমাজে দেখতে চাই।

২৪.০৭.২০০৯

Last Updated ( Thursday, 08 March 2012 21:06 )